Ads

ভারতের কাছে প্রতিদান না চাওয়ার এ কেমন বন্ধুত্ব

 

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২২ জুন নয়াদিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২২ জুন নয়াদিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেনছবি: পিআইডি

মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে কোনো দেশের সরকারপ্রধান যখন প্রতিবেশী রাষ্ট্রে দুবার সফর করেন, তখন মানতেই হবে যে ওই দুই দেশের সম্পর্কে নিশ্চয়ই বিশেষ কিছু ব্যাপার আছে। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে দুই প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেও এর উল্লেখ আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জুন মাসে দুবার দিল্লি সফরের বিষয়টি উল্লেখ করে তাঁকে বন্ধুত্বের আন্তরিকতা ও দৃঢ়তার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। 

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের এই বিশেষত্বের একটি ভালো বিবরণ দিয়েছে ভারতের ফ্রি প্রেস জার্নাল। সেখানে সাংবাদিক জয়ন্ত রায় চৌধুরী লিখেছেন, বেইজিং যাওয়ার আগে শেখ হাসিনার ভারত সফরের বিষয়টি ছিল দিল্লিকে এটা আশ্বস্ত করা যে তার ‘সবার আগে প্রতিবেশী’ (নেইবারহুড ফার্স্ট) নীতি কোথাও যদি কাজ করে থাকে, তাহলে সেটি জ্বলজ্বল করছে ঢাকায় ক্ষমতার অলিন্দে।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্য প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরে তিনি লিখেছেন, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক সময়ের স্রোতে বরফের রূপ নিয়েছে; নেপাল শুধু চীনের দিকেই ঝুঁকেছে তা নয়, মানচিত্রও নতুন করে প্রকাশ করেছে, যাতে কুমাওনের একটি অংশ (বিরোধীয়) তাদের হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং ভুটান চীনের সঙ্গে বৈরিতা এড়াতে এতই উদ্‌গ্রীব যে বেইজিংয়ের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির আলোচনায় তারা ব্যস্ত (নেইবারহুড ডিপ্লোমেসি: ঢাকা ইন্ডিয়াস অনলি বেস্ট ফ্রেন্ড, ২৩ জুন ২০২৪)। 

তিনি আরও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মুইজ্জু মোদির শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলেও চীনপন্থী বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে চলেছেন, যার মধ্যে ভারতের কয়েক ডজন সৈন্যকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করার জন্য কয়েক দফায় কৌশলগত আলোচনাও তিনি বাতিল করেছেন। চীনের ঋণের ফাঁদে আটকা পড়া শ্রীলঙ্কাও যে ঋণ পুনঃ তফসিলীকরণের প্রয়োজনে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াবে, তাতেও কোনো সন্দেহ নেই। তাঁর কথায় পরিস্থিতি এমনই যে প্রতিবেশীদের মধ্যে ‘ভালো বন্ধু’ বলতে একমাত্র ঢাকাই ভরসা। 

গত কয়েক দিনে ভারতীয় সংবাদপত্রগুলোয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফর সম্পর্কে যেসব প্রতিবেদন ও নিবন্ধ ছাপা হয়েছে, তার অধিকাংশেরই মূল কথা হচ্ছে ঢাকাকে পক্ষে টানতে বেইজিংয়ের সঙ্গে দ্বৈরথে এখন পর্যন্ত দিল্লিই এগিয়ে আছে। যদিও তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, তবু সামগ্রিকভাবে সমঝোতার বিষয়গুলোর ব্যাপকতা ও বৈচিত্র্য অনেক বেশি তাৎপর্য বহন করে।

আরও পড়ুন

সন্দেহ নেই তিস্তার পানি ভাগাভাগি নিয়ে দীর্ঘায়িত হতে থাকা অচলাবস্থা সত্ত্বেও তার পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার প্রশ্নে কোনো অর্থায়ন প্রস্তাব ছাড়াই ভারতকে সমীক্ষা চালাতে দেওয়ার বিষয়টি অপ্রত্যাশিত ছিল। কেননা চীন তিস্তার পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার প্রকল্পে শতকোটি ডলার অর্থায়নের প্রস্তাব দিয়েছে কয়েক বছর আগেই এবং সরকার তা প্রত্যাখ্যান করেনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশ্য বলেছেন, চীন ও ভারতের প্রস্তাব দুটির যেটি কল্যাণকর মনে হবে, সেটিই তিনি গ্রহণ করবেন।

ভারতে নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অপেক্ষাকৃত দুর্বল তৃতীয় মেয়াদের যাত্রা এখনো পুরোপুরি গতি পায়নি। কিন্তু এর আগেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তড়িঘড়ি সফর আয়োজন যে স্পষ্টতই তাঁর চীনের সফরসূচির সঙ্গে সম্পর্কিত, সে কথাটি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম যতটা স্পষ্ট করে বলেছে, আমরা ঠিক সেভাবে কাউকে বলতে শুনিনি। 

ডেকান হেরাল্ড উচ্ছ্বসিত শিরোনামে বলেছে, বাংলাদেশের নদী সংরক্ষণ প্রকল্প থেকে ভারত কনুই মেরে চীনকে হটিয়ে দিয়েছে।

রেল সংযোগ সম্প্রসারণের বিষয়ে ইউরোপের দৃষ্টান্তটা ভালো। কিন্তু ইউরোপের মহাদেশজুড়ে রেল সংযোগ আমাদের কথিত কানেকটিভিটির সঙ্গে মোটেও তুলনীয় নয়। আমাদের সংযোগ সম্প্রসারণের সুবিধা মূলত ভারতের সীমানাতেই সীমিত এবং তাতে এক পক্ষ অসম সুবিধা লাভ করবে। দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে সংযোগ সম্প্রসারণ হলেই কেবল তাকে ইউরোপের সঙ্গে তুলনা করা চলে।

কলকাতার টেলিগ্রাফ ‘বাংলাদেশে চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নস্যাৎ ভারতের: ঢাকার নজর পানিবণ্টনে’ শিরোনামে লিখেছিল, ভারত তিস্তার ব্যবস্থাপনা চীনের হাতে চলে যাওয়া ঠেকাতে মরিয়া। কারণ, এটি কেবল তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত প্রতিবেশীর সঙ্গে জল-কূটনীতির ব্যর্থতার ইঙ্গিত বহন করবে না, বড় কৌশলগত উদ্বেগেরও কারণ হবে। টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে, চীনের প্রতি নজর রেখে বাংলাদেশকে ভারতের নদী সংরক্ষণে সহায়তার প্রস্তাব। 

এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রী মোদিকে যে চিঠি দিয়েছেন, তাতে তিস্তার পানি ব্যবস্থাপনা এবং গঙ্গা চুক্তির নবায়ন—দুটোই যে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়বে, তার সম্ভাবনা প্রকট হয়ে উঠছে। নদীর পানি ব্যবস্থাপনা রাজ্যের এখতিয়ার—এই অজুহাত শুধু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তিতে গত এক দশকেও দিল্লি তিস্তা চুক্তি অনুমোদন করতে পারেনি বা করেনি। করেনি কথাটা বলাই যায়, কেননা দিল্লি চুক্তি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিলে ভারতের সুপ্রিম কোর্টেই হয়তো তার মীমাংসা হতো।

আরও পড়ুন

আন্তরাজ্য পানিবণ্টনের বিরোধ নিষ্পত্তিতে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকার কারণেই এমন যুক্তি উঠতে পারে। তিস্তা আটকে রাখার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবার ফারাক্কা থেকে তৈরি হওয়া নানা সমস্যার কথা যেভাবে তাঁর চিঠিতে মোদিকে লিখেছেন, তাতেও মনে হচ্ছে গঙ্গার প্রতিশ্রুত পানি না পাওয়ার হতাশা ভবিষ্যতে শুধুই বাড়বে, কমবে না।

বন্ধু হিসেবে বাংলাদেশ ভারতের কাছে বিশ্বস্ততার প্রমাণ দিয়েছে বলেই সেখানকার সংবাদমাধ্যমের একটা মতৈক্য চোখে পড়ে। তারা প্রায় প্রত্যেকেই মালদ্বীপের মতো বাংলাদেশেও ভারতের পণ্য বয়কট আন্দোলনের গতিপথ নিয়ে তাদের যে উদ্বেগ আছে, সে কথা জানাতে ভোলেনি। কিন্তু সেই বয়কট আন্দোলন উপেক্ষা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরের ফলাফলে তাদের তৃপ্তির বহিঃপ্রকাশই বেশি।

তাদের হিসাবে অর্জনের তালিকায় আছে কম্প্রিহেন্সিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্টের (সেপা) জন্য আলোচনা শুরুর সমঝোতা, রেল সংযুক্তি সম্প্রসারণ, যৌথভাবে সমরাস্ত্র উৎপাদন এবং সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন, ডিজিটাল এবং গ্রিন পার্টনারশিপ ও মহাকাশের অংশীদারত্বের উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, ওই খাতে চীনের দীর্ঘদিনের প্রাধান্যকে খর্ব করার সুযোগ তৈরির উদ্যোগ হিসেবে।

২০১৮ সালের মে মাসে প্রধানমন্ত্রী ভারতে এ রকম একটি সফর শেষ করে আসার পর বলেছিলেন, ভারতকে যা দিয়েছি, তারা তা সারা জীবন মনে রাখবে (৩০ মে ২০১৮–তে গণভবনের সংবাদ সম্মেলন)। এবারের সমঝোতা স্মারকগুলোতে দেখা যাচ্ছে, দেওয়ার পালা শেষ হয়নি।

আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘বাংলাদেশ ভারতের কাছে প্রতিদান চায়’ শিরোনামের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কোনো প্রতিদান চাই না। প্রতিদানের কী আছে?’এখনো তিনি প্রতিদান না চাওয়ার নীতিতে অটল আছেন বলেই মনে হচ্ছে। 

রেল সংযোগ সম্প্রসারণের বিষয়ে ইউরোপের দৃষ্টান্তটা ভালো। কিন্তু ইউরোপের মহাদেশজুড়ে রেল সংযোগ আমাদের কথিত কানেকটিভিটির সঙ্গে মোটেও তুলনীয় নয়। আমাদের সংযোগ সম্প্রসারণের সুবিধা মূলত ভারতের সীমানাতেই সীমিত এবং তাতে এক পক্ষ অসম সুবিধা লাভ করবে। দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে সংযোগ সম্প্রসারণ হলেই কেবল তাকে ইউরোপের সঙ্গে তুলনা করা চলে। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার সহযোগিতা জোট সার্কের প্রায় অপমৃত্যু হয়েছে এবং তার কারণ হচ্ছে ভারত ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। এখন যোগ হচ্ছে চীনের সঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের প্রভাব। 

ভূরাজনীতির প্রভাব শুধু যে পররাষ্ট্রনীতি বা প্রতিরক্ষানীতির মধ্যেই সীমিত থাকছে, তা নয়। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ওপর তার প্রভাব যে কতটা ক্ষতিকর ও প্রকট হতে পারে, সে কথা নিশ্চয়ই নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই।

 কামাল আহমেদ সাংবাদিক

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Ok, Go it!