Ads

শৈশবে ব্যাংক ডাকাতি, ছিলেন দাগি অপরাধী, এখন তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রীড়ামন্ত্রী

গ্যাটন ম্যাকেনজি
গ্যাটন ম্যাকেনজিছবি: এক্স থেকে নেওয়া

পকেটে ফুটো পয়সাও ছিল না। তারপরও স্বপ্ন দেখতেন কোটিপতি হওয়ার। সেই স্বপ্নের ঘোরে কৈশোরেই লুট করে নেন একটি ব্যাংক। তার পর থেকেই দারিদ্র্যের কষাঘাত আর বঞ্চনার জীবন থেকে মুক্তির উচ্চাকাঙ্ক্ষা মাথায় জেঁকে বসে গ্যাটন ম্যাকেনজির।

খুব সহজে ও দ্রুত ওপরে ওঠার সিঁড়ি হিসেবে অপরাধজগৎকে বেছে নেন দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণভিত্তিক মিশ্র জাতিগোষ্ঠীর (কালারড) এই যুবক। ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন গ্যাংস্টার।

তবে একসময় সেই অপরাধের জগৎ থেকে বের হয়ে শুরু করেন ব্যবসা-বাণিজ্য। খনি থেকে শুরু করে নাইট ক্লাব—বিনিয়োগ করেন নানা খাতের ব্যবসায়। সেখানেও আসে সাফল্য। তবে তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর স্বপ্ন তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে এর চেয়েও বড় উচ্চতায়।

একসময়ের অপরাধজগতের এই নেতা জীবনযুদ্ধের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে জায়গা করে নিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার মন্ত্রিসভায়। নতুন সরকারের অধীন দায়িত্ব পেয়েছেন ক্রীড়া, কলা ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রীর।

ম্যাকেনজি অবশ্য রাজনীতিতে নাম লিখিয়েছেন অনেক আগেই। গড়েছেন একটি রাজনৈতিক দলও। মিশ্র জাতিগোষ্ঠীই দলটির সবচেয়ে বড় সমর্থক।

গত ২৯ মে অনুষ্ঠিত হয় দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় নির্বাচন। দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন সিরিল রামাফোসা। তবে তাঁর নেতৃত্বাধীন আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (এএনসি) এবার নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করেন রামাফোসা। গত রোববার তাঁর মন্ত্রিসভায় নিয়োগ দেন ম্যাকেনজিকে।

মন্ত্রী হওয়ার পর ৫০ বছর বয়সী এই রাজনীতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) নিজের একটি ছবি পোস্ট করেছেন। ছবিতে দেখা যায়, ফুটবল খেলার পোশাকে একজোড়া বুট হাতে বসে আছেন তিনি। যেন বুটজোড়া পায়ে দিয়েই মাঠে নেমে পড়বেন। ওই ছবির শিরোনামে ম্যাকেনজি লেখেন, ‘শুভকামনা জানিয়ে পাঠানো সব বার্তার জন্য ধন্যবাদ। আমি শিগগিরই উত্তর দেব। কাজে নেমে পড়তে হবে। তাই এখন নিজেকে প্রস্তুত করতে ব্যস্ত আছি।’

ম্যাকেনজি যেভাবে সব প্রতিকূল পরিস্থিতি উতরে সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছেন, তা দক্ষিণ আফ্রিকায় নজির সৃষ্টি করেছে। ১৬ বছর বয়সে পা দেওয়ার আগেই তিনি প্রথম ব্যাংক ডাকাতি করেন। এরপর পুরোদস্তুর গ্যাংস্টার বনে যান। সাত বছর কাটান কারাগারে। সেখান থেকে মুক্তি পাওয়ার পর শপথ নেন নিজেকে বদলে ফেলার। স্থানীয় একটি রেডিও স্টেশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জীবনসংগ্রামের গল্প তুলে ধরেন তিনি।

২০১৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকাভিত্তিক পাবলিক ব্রডকাস্টার এসএবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ম্যাকেনজি বলেন, ‘আমার পকেটে হয়তো ১২ র‌্যান্ড (দক্ষিণ আফ্রিকার মুদ্রা) ছিল। কিন্তু আমার মনের মধ্যে ছিল বিলিয়ন র‌্যান্ড। আর এই বিষয়ই মানুষ বোঝার চেষ্টা করে না। তারা যা নেই, তা নিয়েই ভাবে, তা পাওয়ার জন্য কী করতে হবে, সেদিকে মনোযোগ দেয় না।’

ম্যাকেনজির বক্তব্য এখন স্থানীয় মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করছে, দিচ্ছে অনুপ্রেরণা। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন জায়গায় বক্তব্য দেওয়ার জন্য ডাক পাচ্ছেন। তাঁর জীবনী নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন বই।

কারাগারে ম্যাকেনজির সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় ক্যানি কুনেন নামের এক কয়েদির। পরবর্তী সময়ে তাঁর সঙ্গে মিলে দক্ষিণ আফ্রিকায় একটি নাইট ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন। জিম্বাবুয়েতে শুরু করেন খনির ব্যবসা। যৌথ উদ্যোগে আরও অনেক ব্যবসা রয়েছে তাঁদের।

দক্ষিণ আফ্রিকাভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আইওএলের তথ্য অনুসারে, নাইট ক্লাবটি একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়। কেপটাউনে ম্যাকেনজির নামে নিবন্ধিত ক্লাবের একটি শাখার বিরুদ্ধে ভাড়া ও বিদ্যুৎ বিল না দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ক্লাবটির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

তখন ম্যাকেনজি বলেছিলেন, ‘ক্লাব করা নিয়ে আমি আগ্রহী নই। অন্য প্রকল্প নিয়ে আমি ব্যস্ত। আমরা জার ব্র্যান্ডের (এই ব্র্যান্ডের অধীন ক্লাবটি পরিচালিত হতো) ইতি টেনেছি। এটি নিয়ে কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নেই।’

বর্তমানে রাজনীতিবিদ হিসেবেই বেশি পরিচিত ম্যাকেনজির। ২০১৩ সালে তিনি প্যাট্রিওটিক অ্যালায়েন্স নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। বন্ধু ক্যানি কুনেনকে দেন দলের নির্বাহীর দায়িত্ব।

এক দশকের বেশি সময় পর জাতীয় নির্বাচনে মোট ভোটের ২ শতাংশ নিজেদের পক্ষে আনতে সক্ষম হয়েছে দলটি। ওয়েস্টার্ন কেপের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে ৮ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে নিজেদের ভালো অবস্থানের জানান দেয় দলটি।

রাজনৈতিক দলটির স্লোগান—‘ওনস বাইজা নি।’ আঞ্চলিক ভাষায় ব্যবহৃত এই কথার অর্থ, ‘আমরা ভয় পাই না।’ আফ্রিকার মোট জনসংখ্যার ৮ শতাংশ মিশ্র জাতিগোষ্ঠীর। সংসদে দলটি এই জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছে।

নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর ম্যাকেনজি বলেন, ‘প্যাট্রিওটিক অ্যালায়েন্সের হাত ধরে প্রথমবারের মতো মিশ্র জাতিগোষ্ঠীর কেউ সংসদে জায়গা করে নিল। আমরাই একমাত্র দল, যেটি সংসদে সব বর্ণের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করবে।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক কাগিসো পোই বিবিসিকে বলেন, সাহসী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নির্বাচনী এলাকায় ম্যাকেনজির বেশ কদর আছে।

ম্যাকেনজি মন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর দক্ষিণ আফ্রিকার শিশুদের নিয়ে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। খেলাধুলায় শিশুদের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে মাদকাসক্তি ও অপরাধের হার কমে আসবে বলে মনে করছেন তিনি।

তবে ম্যাকেনজি চেয়েছিলেন পুলিশবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। তাঁর দাবি, জীবনের একটা সময় একটি অপরাধী চক্রের নেতা ছিলেন। তাই দক্ষিণ আফ্রিকায় অপরাধের উচ্চ হার কমাতে তিনিই সবচেয়ে ভালো কিছু করতে পারেন। 

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Ok, Go it!