Ads

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫ জুলাইয়ের ঘটনার পুনঃপাঠ

 

নারী শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীদের হামলা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, ১৫ জুলাই ২০২৪
নারী শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীদের হামলা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, ১৫ জুলাই ২০২৪প্রথম আলো

শিক্ষার্থী-জনতার বিপ্লবপূর্ববর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে খুব বেশি প্রয়োজনীয় মনে হত না। বরং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে বেশি সময় দেওয়াকে বিপজ্জনক কাজ বলে নিরুৎসাহিত করতাম। কিন্তু শিক্ষার্থী-জনতার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে এই মাধ্যমগুলোর ভূমিকা আমার আগের অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও এ ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীকে পরিমিতিবোধের দিকেও দৃষ্টি রাখতে হবে।

সম্ভবত ১৬ সেপ্টেম্বর, ফেসবুক ঘাঁটতে গিয়ে এক শিক্ষার্থীর প্রোফাইল পিকচার পরিবর্তন নজরে এল। ছবিটি সেই ছবিগুলোর একটি, যা ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ছবিতে দেখা যাচ্ছে যে ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন ছাত্রীকে কোনো একজন যুবক মারধর করেছে অথবা করতে উদ্যত হয়েছে। এ ঘটনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী, সাবেক শিক্ষার্থী ও বর্তমান শিক্ষকদের কাছে যতটা মর্মান্তিক, তার চেয়ে লজ্জার। মনে হয়েছিল নিজের বাড়িতে নিজের মেয়েদের বাইরের লোকজন এসে মেরে চলে গেল। আর আমরা কাপুরুষের মতো তা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম।

এটা বেদনার এই জন্য যে নিজের মেয়েদেরও আমরা নিজেদের ঘরে—এই বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপত্তা দিতে পারলাম না। ছাত্রীদের ওপরে আক্রমণ, আক্রমণের চরিত্র ও ধরন এবং আক্রমণকারীদের পরিচয় (যতটুকু পত্রিকায় এসেছিল), তা দেখে ঘরে থাকা কারও কারও জন্য প্রায় অসম্ভব ছিল। সেদিন গুটিকয় শিক্ষক সেই পীড়ন অনুভব করে বের হয়েছিলেন। শিক্ষার্থী-জনতার আন্দোলনে সেই ছবিটা অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছিল, অন্তত আমার ক্ষেত্রে।

এই ছবিটাসহ আর কতগুলো ছবির কারণেই আমরা কেউ কেউ ঝুঁকি সত্ত্বেও শিক্ষার্থী আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণ করি। ১৬ সেপ্টেম্বর সেই পীড়নের কথা মনে হতেই নিজের ফেসবুকে একটি কমিশন গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করি। এক শিক্ষার্থী সেদিন মেসেজ করে জানিয়েছিল যে তারা একটি আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কমিশন গঠনের দাবিও করেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর এই হামলার ঘটনা তদন্তের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গত প্রশাসনও একটা কমিটি করেছিল। সেই কমিটির কাজ কতটুকও এগিয়েছে জানা নেই। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপ্লব–পরবর্তী প্রশাসন গত ২৯ সেপ্টেম্বর একটি নতুন কমিটি গঠন করেছে।

ছাত্রীদের ওপরে আক্রমণ, আক্রমণের চরিত্র ও ধরন এবং আক্রমণকারীদের পরিচয় (যতটুকু পত্রিকায় এসেছিল), তা দেখে ঘরে থাকা কারও কারও জন্য প্রায় অসম্ভব ছিল। সেদিন গুটিকয় শিক্ষক সেই পীড়ন অনুভব করে বের হয়েছিলেন। শিক্ষার্থী-জনতার আন্দোলনে সেই ছবিটা অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছিেল।

১৫ তারিখের ঘটনা এতটা গুরুত্বপূর্ণ কেন? এ ঘটনা আওয়ামী সরকার পতনের আন্দোলন তরান্বিত করেছিল। গত ১৫ বছর রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের শত অত্যাচার সত্ত্বেও সামাজিক জনমত তৈরি করতে পারেনি। সরকার–সমর্থক গোষ্ঠীর আক্রমণে ১৫ তারিখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, বিশেষ করে মেয়ে শিক্ষার্থীরা নির্মম অত্যাচারের শিকার না হলে সরকার পতনের বিষয় সামনে আসতে পারত কি না, আমার সন্দেহ হয়।

১৫ তারিখ পর্যন্ত এই আন্দোলন ছিল কোটাসংশ্লিষ্ট বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন। ১৫ তারিখের পরে এটা হয়ে গেল ‘নিরাপদ ক্যাম্পাসে আমার মেয়েদের মারবে কেন’—সরকারবিরোধী আন্দোলন। সরকার হত্যাযজ্ঞে সেই সময় লিপ্ত না হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মেয়ে শিক্ষার্থীদের লাঞ্ছিত করার জন্য যে সামাজিক ক্ষোভ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল, তা সামাল দিতে পারত না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা পরিচয়ের কারণে এই আন্দোলনের মানসিক ও সামাজিক আবেগ দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আবেদনের সঙ্গে মিশে গিয়ে এক নতুন ক্ষোভের বাংলাদেশ তৈরি করত। ভাগ্য ভালো যে এত দিন অপেক্ষা করতে হয়নি। আবার ভাগ্য খারাপ, কারণ এই আন্দোলনের পরিক্রমায় সরকারের দ্রুত পতনের জন্য অনেক রক্ত দিতে হলো।

১৫ জুলাইয়ের ঘটনার সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ের তোফাজ্জল হত্যা যুক্ত হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডটি অত্যন্ত নির্মম, পীড়াদায়ক ও মর্মান্তিক। বৈষম্যবিরোধীদের ব্যাপক সাফল্যের পর এই ক্যাম্পাসে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড সবাইকে মর্মাহত করেছে। এ ক্ষেত্রে বিচারের আহ্বান এড়িয়ে না গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ সবার মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি করেছে। আশা করছি, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই দ্রুত বিচারের মুখোমুখি হবে। তবে নিপীড়নের শিকার এই ব্যক্তিকে কেন আহত অবস্থায় উদ্ধার করা গেল না—এই প্রশ্নটা এখনো গুরুত্বপূর্ণ। এটা কি ক্রিমিনালাইজেশন অব পলিটিকসের মাধ্যমে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা কি না, সেটাও খতিয়ে দেখা দরকার।

আমাদের রাজনৈতিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক ও সামাজিক স্বাস্থ্যও যে ব্যাধিগ্রস্ত, এই হত্যাকাণ্ড আমাদের এটা আবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। এ জন্য ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ে টেকসই শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে হলে যেকোনো নির্যাতন ও নিপীড়নের ক্ষেত্রে প্রিএমটিভ মেজারস কীভাবে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে বেশ ভাবতে হবে। হত্যাকাণ্ড ঘটার পর বিচারের ব্যবস্থা যেন প্রয়োজন না হয়, আগেই যেন তাকে উদ্ধার করা যায়, সেইটাই এখন দরকার।

অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। অথচ প্রথমে দরকার ক্ষত সারানোর। ক্ষত সারিয়ে নিরাপদে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রক্রিয়ায় কীভাবে শিক্ষার্থীরা টেকসইভাবে শ্রেণিকক্ষে থাকতে পারে এবং নিজেদের লেখাপড়ায় মনোযোগ দিতে পারে, সেই মানসিক ও সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। অন্যথায় তোফাজ্জল হত্যাকাণ্ড ছাড়াও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি হওয়া নতুন মোমেন্টাম নতুন সংকট নিয়ে আসতে পারে। শিক্ষার্থীদের মানসিক পীড়ার মধ্যে রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা কঠিন। আর ইতিবাচক পরিবেশ ছাড়া পড়াশোনার টেকসই পরিবেশ তৈরি যাবে—এটা ভাবা ভুল। আশা করি, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালকেরা আমাদের সবার আন্তরিক সহযোগিতায় দ্রুত শিক্ষাবান্ধব একটা পরিবেশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিশ্চিত করতে পারবেন।

১৫ জুলাই থেকে আজকে পর্যন্ত প্রায় আড়াই মাসের বেশি অতিবাহিত হয়েছে। নতুন কমিটি গঠিত হয়েছে। এই কমিটির কার্যকর সুপারিশের ওপর নির্ভর করবে আগামীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্র। কমিটির বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য থাকলেও তাদের অনেক সময় দেওয়ার সুযোগ নেই। ১৫ জুলাই থেকে ঘটা ঘটনাগুলো উদ্‌ঘাটন করে, দ্রুত সত্যিকারের দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে বিচারের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে এই কমিটিকে রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন—উভয়কেই সহযোগিতা করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় এক সামাজিক সত্ত্বা। এখানে জাতি, ধর্ম ও জেন্ডার পরিচয়ের বিস্তৃত অবয়বের স্থান থাকতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুন রাজনৈতিক সমাজ নির্মাণের সহযোগি করে গড়ে তুলতে হবে। সমাজে রাজনৈতিক স্বপ্নের জন্য মানসিক তাড়না তৈরি না করলে সবই ব্যর্থ হতে পারে। বর্তমান রাজনৈতিক ভাবনাগুলো যাঁচাই করে তা বাস্তবায়নে যথার্থ কর্মসূচি আর তা তদারকের চৌকস কাঠামো এখনো প্রত্যক্ষভাবে সামনে আসেনি। সময় এত নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য এত সময় থাকেও না।

কাজী মোহাম্মাদ মাহবুবুর রাহমান, সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Ok, Go it!