Ads

অনেকেই আমাকে ‘পতাকা চাচা’ বলে ডাকে

 

মির্জা আনোয়ার হোসেনের কাছে নানা আকারের পতাকা আছে
মির্জা আনোয়ার হোসেনের কাছে নানা আকারের পতাকা আছে
ছবি: প্রথম আলো

খুলনার খালিশপুরে আমাদের আদি বাড়ি। খালিশপুর ক্রিসেন্ট জুট মিলের সামনে ছিল আব্বার (মির্জা আফসার উদ্দীন) দরজির দোকান। ছোটবেলা থেকে আব্বাকে সেলাইয়ের কাজে সহযোগিতা করতাম। এই করতে করতেই সেলাইয়ের কাজটা শিখে নিয়েছিলাম। তবে পতাকা বানানোর সঙ্গে মিশে আছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি।

১৯৭১ সালে আমার বয়স ছিল ১৬ বছর। নবম শ্রেণিতে পড়তাম। এলাকাতেই ছিলাম। আব্বার দরজির দোকানে দেখতাম মুক্তিবাহিনীর লোকজন আসতেন। কেউ কেউ দোকানে অস্ত্রশস্ত্রও লুকিয়ে রাখতেন। তাঁদের কাছে সারা দেশের যুদ্ধের খবর নিতাম। ১৬ ডিসেম্বর দেশ বিজয়ের খবরও তাঁদের কাছে জেনেছিলাম; কিন্তু সেদিনও আমাদের এলাকা হানাদারমুক্ত হয়নি। পরের দিন ১৭ ডিসেম্বর সকালে খালিশপুর গোলচত্বরে স্বাধীন দেশের পতাকা উত্তোলন করতে গিয়েও পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে একজন শহীদ হন।

সকালের ঘটনার পর চিন্তা করেছিলাম—আমি তো সেলাইয়ের কাজ পারি, আজ নিজেই পতাকা তৈরি করব। তখন তো পতাকায় সবুজের ওপর লাল সূর্যের মধ্যে হলুদ রঙের বাংলার মানচিত্র ছিল। প্রথমবার অনেক চেষ্টা করে তৈরি করলাম। আমার তৈরি করা প্রথম পতাকাটা মুক্তিবাহিনীর লোকজন নিয়ে উড়িয়েছিলেন। সেদিনই খালিশপুর শত্রুমুক্ত ঘোষণা করা হয়।

আরও পড়ুন
৫০ বছরের বেশি সময় ধরে জাতীয় পতাকা তৈরি করে চলেছেন মির্জা আনোয়ার হোসেন
৫০ বছরের বেশি সময় ধরে জাতীয় পতাকা তৈরি করে চলেছেন মির্জা আনোয়ার হোসেন
ছবি: প্রথম আলো

সেই থেকেই জাতীয় পতাকা তৈরি শুরু। স্বাধীন বাংলাদেশে পতাকার বেশ চাহিদাও ছিল। বানিয়ে বানিয়ে বিক্রি করতাম। পাশাপাশি অন্যান্য কাপড় সেলাইয়ের কাজও করতাম।

সবকিছু বেশ ভালোই চলছিল। ১৯৮৫ সালে আব্বা মারা যান। সংসারে আরেকটু সচ্ছলতার জন্য বিদেশে যেতে চেয়েছিলাম। এ জন্য দোকানঘর বিক্রি করে তার সঙ্গে আরও কিছু টাকা ঋণও নিই। মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য সব টাকা এক দালালের কাছে দিয়ে প্রতারিত হই। ঘাড়ের ওপর ঋণের বোঝা আর অসম্মানের সঙ্গে এলাকায় থাকাটা একেবারে অসম্ভব হয়ে পড়ে তখন। বাধ্য হয়ে পরিবারসহ সাতক্ষীরার আশাশুনি এলাকায় চলে যাই। পরবর্তীকালে জমি বিক্রি করে সেই ঋণ শোধ করি। তবে খালিশপুরে আর ফেরা হয়নি। এরপর ২০০১ সালের দিকে কয়রায় চলে আসি। তবে যেখানেই থেকেছি, পতাকা তৈরি করেছি।

জাতীয় পতাকা তৈরি করি মনের তাগিদে

কয়রা উপজেলার যত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেন আছে, সব প্রতিষ্ঠান আমার কাছ থেকেই জাতীয় পতাকা বানিয়ে নেয়। এ ছাড়া দূরের কাস্টমাররাও আছেন। তাঁরা মোবাইল করে পতাকার অর্ডার দেন। বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস আর একুশে ফেব্রুয়ারির (আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস) সময় আমার বানানো পতাকা ভালো বিক্রি হয়। তবে ডিসেম্বর মাসে সবচেয়ে বেশি। ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকেও অনেক অর্ডার থাকে। এ সময় কাপড় কেটে এলাকার নারীদের কাছে সেলাই করতে দিই।

এ ছাড়া ফুটবল ও ক্রিকেট বিশ্বকাপ ঘিরেও পতাকার চাহিদা থাকে। সে সময় অন্য দেশের পতাকাও বানাই। তবে বাংলাদেশের পতাকা তৈরি করি মনের তাগিদে। জাতীয় পতাকা বানানো আমার শুধু পেশা নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু। বছরের অন্য সময় যখন পতাকা বেচাবিক্রি বেশি হয় না, তখন অন্য কাপড়চোপড়ও সেলাই করি; কিন্তু পতাকা বানানোর এই কাজ ছাড়ি না। দীর্ঘদিন পতাকা বানানোর সঙ্গে যুক্ত থাকায় এখানকার অনেকেই আমাকে ‘পতাকা চাচা’ বলেও ডাকেন। ভালোই লাগে শুনতে।

আমার কাছে অনেক ধরনের পতাকা আছে। কয়রা থেকেই কাপড় কিনে বানাই। ছোট পতাকা বিক্রি করি ১০ টাকা, মাঝারি আকারের ২০ টাকা থেকে ৩০ টাকা আর একটু বড় আকারেরটা ৫০ টাকায়। প্রতিটি পতাকা বানানোর সময় দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, বৃত্ত ঠিক করে কাপড় কাটি।

আমার পাঁচ মেয়ে আর এক ছেলে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছি। স্ত্রী মারা গেছে ২০১৪ সালে। একমাত্র ছেলে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অল্প বেতনে চাকরি করে। একাই থাকি কয়রায়। প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে কয়েক কিলোমিটার দৌড়াই। শরীরে কোনো রোগবালাই নেই, জীবনে কোনো আফসোসও নেই। বাকি জীবনটা পতাকা বানিয়েই কাটিয়ে দিতে চাই।


Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Ok, Go it!