Ads

পূর্ব ইউরোপকে নিজের নিরাপত্তা নিজের কাঁধেই নিতে হবে

 

অভিবাসী স্রোত ঠেকাতে সীমান্তে বেড়া নির্মাণ করছে পোল্যান্ড
অভিবাসী স্রোত ঠেকাতে সীমান্তে বেড়া নির্মাণ করছে পোল্যান্ডছবি: রয়টার্স

পোল্যান্ডে একটি প্রবাদ আছে, ‘দনেস্কের (পোল্যান্ডের শহর) জন্য কেউ এসে জীবন দেবে না।’ এটি আসলেই ঠিক।

বাস্তবতা হলো, পশ্চিমা দেশগুলো পোল্যান্ডকে কতটুকু নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছে, তা আর এখন কোনো বড় বিষয় নয়।

কারণ, এখানকার অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করে, আমাদের নিজেদের রক্ষার দায়িত্ব আমাদের নিজেদের ঘাড়েই নিতে হবে।

ন্যাটো চুক্তির ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে, ন্যাটোর যেকোনো সদস্যের ওপর হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এই পারস্পরিক-প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে পোল্যান্ডের এখনো আস্থা রয়েছে।

তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা বহুবার ন্যাটো অঞ্চলের ‘প্রতি ইঞ্চি রক্ষায়’ তাঁদের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করলেও এই হাইব্রিড যুদ্ধের যুগে ন্যাটো চুক্তির ৫ নম্বর ধারায় উল্লেখ করা দায়িত্বগুলোর বাস্তবায়ন ক্রমেই ফিকে হয়ে এসেছে।

আরও পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির নেতারা ইউক্রেন যুদ্ধের তীব্রতা বেড়ে যাওয়াকে নিজেদের জন্য বড় ভয়ের বিষয় বলে ক্রমাগত ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন। কিন্তু তার বিপরীতে তাঁরা ন্যাটোর নিরাপত্তার নিশ্চয়তাকে অধিকতর আস্থাযোগ্য করতে পারেননি।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিশেষত সেনাশক্তি ও অস্ত্রশিল্পের দিক থেকে ইউরোপ এখন এতটাই দুর্বল যে রাশিয়া যদি এস্তোনিয়ায় আক্রমণ করে বসে তাহলে ইউরোপের নেতারা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবেন, তা মোটেও পরিষ্কার নয়।

বাস্তবতা হলো, চলমান যুদ্ধে যুক্তরাজ্যের চেয়ে পোল্যান্ড ইউক্রেনে বেশি ট্যাংক পাঠিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে পোল্যান্ড এবং বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলো শুধু যে নিজেদের আরও উন্নত অস্ত্রসজ্জায় সজ্জিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা-ই নয়, বরং রাশিয়া, বেলারুশ এবং (আংশিকভাবে) ইউক্রেনের সঙ্গে তাদের সীমানা ঘেঁষে প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য যথেষ্ট সম্পদ ব্যয় করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আরও পড়ুন

পোল্যান্ডে এই পরিকল্পনার আনুষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয়েছে ‘শিল্ড ইস্ট’। তবে পোল্যান্ডের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিখ্যাত ফরাসি ম্যাগিনোট লাইনের নামানুসারে এটি ইতিমধ্যেই ‘টাস্ক লাইন’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে।

পোল্যান্ড সরকার এই প্রকল্পের জন্য ২৬০ কোটি ডলার বরাদ্দ করেছে। প্রকল্পটি ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু পুরো কাজ শেষ করার জন্য এই বরাদ্দ অপর্যাপ্ত বলে মনে হচ্ছে।

শুধু বেলারুশের সঙ্গে লাগোয়া সীমান্তে বেড়া নির্মাণে (যেটি আগের সরকার তৈরি করেছিল) খরচ হয়েছে ৩৯ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। রাশিয়া ও বেলারুশ থেকে ধেয়ে আসা অভিবাসীদের প্রবাহ আটকাতে এই বেড়া প্রায়ই ব্যর্থ হয়েছে।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, নিজেদের দেশের প্রতিরক্ষার জন্য পোল্যান্ডের জনগণ বড় ধরনের আর্থিক ত্যাগ স্বীকার করতে রাজি আছে।

এর বাইরে পোল্যান্ড রুশ হুমকি নিয়ে আগের চেয়ে অনেক সচেতন হয়ে ওঠা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাহায্যের ওপরও নির্ভর করছে। রাশিয়া ও বেলারুশের সীমান্তের সঙ্গে পোল্যান্ডের পাশাপাশি ইইউর পূর্ব সীমান্তও লাগোয়া রয়েছে।

এতে বোঝা যায়, এই বেড়া ইইউ দেশগুলোর যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে সুরক্ষিত হওয়া উচিত।

আরও পড়ুন

যদিও পোল্যান্ডের আগের অনুদারপন্থী সরকার তাদের অযৌক্তিক জার্মান বিদ্বেষের কারণে জার্মানির নেতৃত্বাধীন ‘আয়রন ডোম’ নামের বেড়া তৈরির উদ্যোগে শরিক হতে অস্বীকার করেছিল, তবে বর্তমান টাস্কের সরকার সম্প্রতি এই কৌশলগত ভুলটি সংশোধন করে নিয়েছে৷

তারা এ বিষয়ে এখন জার্মানির সঙ্গে কাজ করতে রাজি হয়েছে। পোল্যান্ড ও বাল্টিক দেশগুলো ফিনল্যান্ডের তুলনায় একটু ভিন্ন কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে।

ফিনল্যান্ডের রয়েছে চৌকস সেনাবাহিনী, সুপ্রশিক্ষিত জনসংখ্যা এবং নিজেদের বানানো বিপুলসংখ্যক বোমাপ্রতিরোধী আশ্রয়স্থল।

তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তার বিশাল ভূখণ্ডে জনবসতি কম এবং বেশির ভাগ ভূমিতে ঘন সন্নিবিষ্ট বনভূমি রয়েছে, যা যেকোনো আক্রমণকারীর হামলাকে কঠিন করে তুলবে।

ফিনল্যান্ডের মানুষ মনে করেন, তঁাদের ভূখণ্ডে শত্রুরা ঢুকলেও তাদের প্রতিহত করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হবে। তাঁরা মনে করেন, যুদ্ধের সাফল্য বা ব্যর্থতা সীমান্তের নিরাপত্তার ওপর নির্ভর করে না।

সম্প্রতি বাল্টিক দেশগুলো একটি যৌথ পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। তাতে সরকারগুলো ৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার ব্যয়ে শুধু এস্তোনিয়ার সীমান্তে ৬০০ সুরক্ষিত বাংকার তৈরির কথা বলা হয়েছে। লিথুয়ানিয়াতে অনুপ্রবেশকারী যান ও ট্যাংক আটকে দেওয়া সুদীর্ঘ পরিখা খনন করা হবে বলেও সেখানে বলা হয়েছে। তবে এসব কাজ শেষ হতে কয়েক বছর লেগে যাবে।

তবে বাল্টিক দেশগুলো মনে করে, নিরাপত্তার জন্য তাদের ‘বাল্টিক ডিফেন্স লাইন’ শীর্ষক একটি নিরাপত্তাবেষ্টনী দরকার, যা কিনা তাদের পূর্বাঞ্চলীয় সীমন্তকে সুরক্ষিত রাখবে।

সম্প্রতি বাল্টিক দেশগুলো একটি যৌথ পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। তাতে সরকারগুলো ৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার ব্যয়ে শুধু এস্তোনিয়ার সীমান্তে ৬০০ সুরক্ষিত বাংকার তৈরির কথা বলা হয়েছে।

লিথুয়ানিয়াতে অনুপ্রবেশকারী যান ও ট্যাংক আটকে দেওয়া সুদীর্ঘ পরিখা খনন করা হবে বলেও সেখানে বলা হয়েছে। তবে এসব কাজ শেষ হতে কয়েক বছর লেগে যাবে।

সে কারণে রাশিয়ার আগ্রাসন ঠেকাতে নিরাপত্তাপ্রাচীর বানানোর চেয়ে এ মুহূর্তে ইউরোপকে ইউক্রেন যুদ্ধের দিকে বেশি মনোযোগী হতে হবে।

● স্লাভমির সিয়েরাকোভস্কি পোল্যান্ডভিত্তিক রাজনৈতিক আন্দোলন ক্রিতিকা পলিতিসনার প্রতিষ্ঠাতা

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত

Post a Comment

0 Comments
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Ok, Go it!